ভূগোল ও ঐতিহ্য
হারিয়ে যাওয়া নদীর গল্প
নদীমাতৃক দেশ বলেই তো পরিচয় বাংলাদেশের। অথচ সেই একই দেশে শত শত নদী আজ আর নেই — কোনোটা সরু খাল হয়ে গেছে, কোনোটা পুরোপুরি মুছে গেছে মানচিত্র থেকে।
যে সংখ্যাটা অবাক করে
নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে খুঁজেছেন বাংলাদেশের নদী-খালের পুরনো পথরেখা। তাঁর গ্রন্থে নথিবদ্ধ আছে ৫০০-এর বেশি বিলুপ্ত নদী-খালের হিসাব। এই একটা সংখ্যাই বলে দেয়, একসময় দেশের ভূগোল জুড়ে জালের মতো ছড়িয়ে ছিল অসংখ্য জলধারা — যার সিংহভাগ আজ কেবল কাগজে টিকে আছে।
করতোয়া — একদা যে ছিল বিশাল
উত্তরবঙ্গের করতোয়া নদীর গল্পটা যেন সংকোচনের গল্প। সপ্তম শতাব্দীতে চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং যে প্রকাণ্ড, বেগবান নদীর কথা লিখে গেছেন, ঐতিহাসিকদের মতে সেটাই ছিল প্রাচীন করতোয়া — সেই সময়কার বরেন্দ্র ভূমির সীমানা নির্দেশক নদী। আজকের করতোয়া সেই বিশালত্বের ছায়ামাত্র, অনেক জায়গায় নাব্যতা হারিয়ে সরু খালে পরিণত হয়েছে।
কপোতাক্ষ — যে নদীর সংযোগ কাটা পড়েছিল
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কপোতাক্ষের গল্পটা আরেকটু আলাদা। এর উৎপত্তি মাথাভাঙ্গা নদী থেকে, যা একসময় সরাসরি গঙ্গার সাথে যুক্ত ছিল। নদীর পথ সংক্ষিপ্ত করতে একটা খাল কাটা হয়েছিল, আর তাতেই মাথাভাঙ্গার মূল স্রোত ঘুরে গেল অন্যদিকে — গঙ্গা-মাথাভাঙ্গা-কপোতাক্ষের সংযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। ফলে কপোতাক্ষের স্রোত দুর্বল হতে হতে আজ গ্রীষ্মকালে ঝিকরগাছার কাছে প্রায় শুকিয়েই যায়। কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের এত প্রিয় এই নদী আজ নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতেই যেন লড়ছে।
কারণগুলো একটু খুঁজলে
পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়া, উজানে বাঁধ বা সেচ প্রকল্পের কারণে পানিপ্রবাহ আটকে যাওয়া, নদীর পাড় দখল করে স্থাপনা তৈরি, আর পরিকল্পিতভাবে খাল-নদী ভরাট করে জমি বানানো — এই সবকিছু মিলেই একেকটা নদীকে ঠেলে দেয় মৃত্যুর দিকে। এর সাথে যোগ হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন — বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাওয়ায় অনেক মৌসুমি নদীর প্রবাহ এমনিতেই কমে যাচ্ছে।
একটা নদী হারালে যা হারায়
একটা নদী শুকিয়ে যাওয়া মানে শুধু পানির একটা ধারা হারানো নয়। তার সাথে হারিয়ে যায় নদীকেন্দ্রিক জনপদ, নৌবন্দর, মৎস্যজীবীদের জীবিকা, আশেপাশের বাস্তুতন্ত্র — আর শত শত বছরের একটা সংস্কৃতি। ভৈরব নদীর দুই তীরে একসময় গড়ে উঠেছিল বাণিজ্য, হাট-বাজার, জনজীবনের এক সমৃদ্ধ ইতিহাস — নদী শুকিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে সেই ইতিহাসও ধীরে ধীরে বিবর্ণ হয়ে আসছে।
ফিরিয়ে আনার চেষ্টা
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন নদী দখলমুক্ত করা আর খনন কার্যক্রম চালাচ্ছে, কিছু এলাকায় খাল পুনঃখননের প্রকল্পও নেওয়া হয়েছে। তবে গবেষকরা বলছেন, শুধু টুকরো টুকরো উদ্যোগে কাজ হবে না — দরকার দখলমুক্তকরণ, নিয়মিত খনন আর দূষণ রোধের একটা দীর্ঘমেয়াদী, সমন্বিত পরিকল্পনা। নয়তো মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়া নদীর সংখ্যাটা শুধু বাড়তেই থাকবে।
← লেখা তালিকায় ফিরে যাও