বাংলা ক্যালেন্ডার বিডি
কুয়াশাচ্ছন্ন সোনালি ধানক্ষেত, ভোরের আলোয় কৃষি ও ঐতিহ্য

বাংলার হারিয়ে যাওয়া ধানের কথা

একবার ভাবুন তো — একটা দেশে দশ হাজারেরও বেশি জাতের ধান ছিল। প্রতিটার নিজের স্বাদ, নিজের গন্ধ, নিজের একটা গল্প। আজ সেই দশ হাজারের সিংহভাগই নেই, নাম শুনলেও কেউ চিনতে পারবে না।

এক সময়ের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার

বিভাজন-পূর্ব অবিভক্ত বাংলায় এই সংখ্যাটা ছিল বাস্তব — দশ হাজারেরও বেশি স্থানীয় জাতের ধান চাষ হতো এখানে। জলবায়ু, মাটির ধরন আর এলাকাভেদে কৃষকরা নিজেদের মতো করে বীজ সংরক্ষণ করতেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। বাদশাভোগ, তুলাইপাঞ্জি, কালোনুনিয়া, দুধকলম, চিনিগুঁড়া, রাধুনিপাগল — এই নামগুলো আজও প্রবীণ কৃষকদের মুখে মুখে ঘোরে, যদিও মাঠে গিয়ে খুঁজলে এগুলো আর পাওয়া যাবে না।

কেন এমনটা হলো

বিশ শতকের মাঝামাঝি "সবুজ বিপ্লব" এসে সব বদলে দিল। উচ্চফলনশীল ও সংকর জাতের ধান দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল — কম সময়ে বেশি ফলনের প্রতিশ্রুতি ছিল, আর বাড়তি জনসংখ্যার খাবারের জোগান দেওয়াটাও তখন জরুরি ছিল। কিন্তু এর ফল হলো, দেশি জাতের চাষ ধীরে ধীরে কমতে শুরু করল। একবার কোনো জাতের বীজ কারো হাত থেকে হারিয়ে গেলে সেটা আর ফিরে পাওয়া যায় না — এই সরল সত্যটা তখন কেউ ঠিক বুঝতে পারেনি।

শুধু কি এই একটা কারণ

না, আরও কিছু ছিল। নদীভাঙন, জলাভূমি ভরাট হয়ে যাওয়া, রাসায়নিক সারনির্ভর একক চাষপদ্ধতি, বীজ বাজারের বাণিজ্যিকীকরণ — সবই মিলেমিশে দেশি ধানের বৈচিত্র্য কমিয়ে দিয়েছে। কিছু জাত ছিল একেবারে নির্দিষ্ট পরিবেশের জন্য মানানসই — যেমন লবণাক্ত উপকূল বা বন্যাপ্রবণ নিচু জমি। সেই বিশেষায়িত জ্ঞানটাও কালক্রমে হারিয়ে গেছে, বীজের সাথে সাথেই।

অঞ্চলভেদে হারানো কিছু নাম

উত্তরাঞ্চলের ঠাকুরগাঁও এলাকায় একসময় দাদখানি চাল ও উড়কি ধানের চল ছিল, যা থেকে তৈরি হতো মুড়কি — এই এলাকায় এখন এসবের চাষ প্রায় নেই বললেই চলে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবীণ কৃষকরা এখনও স্মৃতি হাতড়ে বলতে পারেন পঙ্খিরাজ, লক্ষ্মীজটা, রানি স্যালুট, ঝুমুর বালাম, হিজলদিঘি, রাজা মোড়লের মতো নামগুলো — কিন্তু খুঁজতে গেলে এগুলো এখন প্রায় অসম্ভব। তবে বরিশাল অঞ্চলে এখনও কিছু দেশীয় জাত টিকে আছে বলে জানা যায় — পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি সব।

কী হারালাম আসলে

এই দেশি জাতগুলোর মধ্যে ছিল প্রাকৃতিক রোগ-পোকা প্রতিরোধ ক্ষমতা, খরা-বন্যা সহ্য করার সহজাত শক্তি, আর এমন সব স্বাদ-গন্ধ যা আধুনিক সংকর জাতে পাওয়া যায় না। জিনগত বৈচিত্র্য কমে যাওয়া মানে ভবিষ্যতের জলবায়ু পরিবর্তনের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রাকৃতিক অস্ত্রও কমে যাওয়া।

তবু আশা আছে

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI)-এর জিন ব্যাংকে আজও সংরক্ষিত আছে হাজার হাজার স্থানীয় জাতের নমুনা। আর দেশের কোনো কোনো প্রান্তে কিছু কৃষক এখনও পুরনো পদ্ধতিতে বীজ জমিয়ে রাখেন, যেন সেটাই একটা লড়াই — না বলা এক প্রতিরোধ। এই মানুষগুলোই আসলে হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার শেষ আশা।

← লেখা তালিকায় ফিরে যাও