লেখা · ভাষা ও সংস্কৃতি
বাংলা ভাষার ইতিহাস: সংস্কৃত থেকে আজকের বাংলা
প্রকাশিত: ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আজ যে ভাষায় আমরা কথা বলি, কবিতা লিখি, গান গাই — সেই বাংলা ভাষার বয়স প্রায় হাজার বছরেরও বেশি। এই দীর্ঘ যাত্রায় বাংলা বহুবার রূপ বদলেছে, বহু ভাষা আর সংস্কৃতির সংস্পর্শে এসেছে, আর শেষ পর্যন্ত পরিণত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ সাহিত্য-ভাষায়।
উৎপত্তি: সংস্কৃত থেকে প্রাকৃত
বাংলা ভাষার শিকড় প্রোথিত ইন্দো-আর্য ভাষা পরিবারে। সংস্কৃত ছিল প্রাচীন ভারতের শিক্ষিত ও ধর্মীয় শ্রেণির ভাষা, কিন্তু সাধারণ মানুষ কথা বলত আরও সহজ, পরিবর্তনশীল "প্রাকৃত" ভাষায়। পূর্ব ভারতে প্রচলিত ছিল মাগধী প্রাকৃত, যা সময়ের সাথে সাথে রূপান্তরিত হয় মাগধী অপভ্রংশে। প্রায় দশম-দ্বাদশ শতাব্দীর দিকে এই অপভ্রংশ থেকেই ধীরে ধীরে জন্ম নেয় বাংলা, অসমিয়া ও ওড়িয়ার মতো পূর্ব ভারতীয় নব্য ভাষাগুলো।
ভাষার বিবর্তনের ধাপ
-
প্রাচীন বাংলা যুগ (আনুমানিক ১০ম–১২শ শতাব্দী)
চর্যাপদ: বাংলা ভাষার প্রাচীনতম প্রমাণ
বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকদের রচিত দোহা-সংকলন "চর্যাপদ"-কে বাংলা ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন ধরা হয়। ১৯০৭ সালে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজদরবারের গ্রন্থাগার থেকে এর পুঁথি আবিষ্কার করেন। এই পদগুলোর ভাষা আজকের বাংলার সাথে সরাসরি না মিললেও, ভাষাতাত্ত্বিকরা একে বাংলার আদি রূপ হিসেবেই চিহ্নিত করেন।
-
মধ্যযুগীয় বাংলা (আনুমানিক ১৪শ–১৮শ শতাব্দী)
অনুবাদ সাহিত্য ও বৈষ্ণব পদাবলি
এই সময়ে রামায়ণ ও মহাভারতের বাংলা অনুবাদ, মঙ্গলকাব্য এবং চণ্ডীদাসের মতো কবিদের বৈষ্ণব পদাবলির মাধ্যমে বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ হতে শুরু করে। ভাষার কাঠামো এই সময়েই আজকের বাংলার অনেকটা কাছাকাছি রূপ নেয়।
-
আধুনিক বাংলা যুগ (১৯শ শতাব্দী থেকে)
মান্য গদ্যের জন্ম
কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের হাত ধরে বাংলা গদ্যের একটা মান্য, সুশৃঙ্খল রূপ তৈরি হয়। পরবর্তীতে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে বাংলা সাহিত্য পৌঁছে যায় বিশ্বমানে — ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান, যা এশিয়ার মধ্যে প্রথম।
-
১৯৫২ সাল
ভাষা আন্দোলন ও একুশে ফেব্রুয়ারি
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ভাষা আন্দোলনে প্রাণ দেন বহু ভাষাশহীদ। এই আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতিসংঘ ২১ ফেব্রুয়ারিকে "আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস" হিসেবে ঘোষণা করে, আর বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনেরও একটা গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি হয় এই আন্দোলন থেকেই।
আজকের বাংলা
আজ বাংলা ভাষা বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মানুষের কথ্য ভাষাগুলোর একটি — বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসামসহ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি মানুষের মাতৃভাষা। এই ভাষার লিখিত রূপ শেখার সূচনা হয় যেই আদর্শলিপি দিয়ে, তার ইতিহাস জানতে পড়তে পারো আমাদের বাংলা আদর্শলিপি নিয়ে লেখাটি। আর বাংলা সন কীভাবে এই একই সাংস্কৃতিক ধারার সাথে জড়িয়ে গড়ে উঠেছে, তার গল্প জানতে দেখো বাংলা সনের ইতিহাস।
